সাহাবায়ে কিরামের মর্যাদা: ঐতিহাসিক বর্ণনা নয়, সহীহ দলিলের আলোকে


وَ السّٰبِقُوْنَ الْاَوَّلُوْنَ مِنَ الْمُهٰجِرِیْنَ وَ الْاَنْصَارِ وَ الَّذِیْنَ اتَّبَعُوْهُمْ بِاِحْسَانٍۙ-رَّضِیَ اللّٰهُ عَنْهُمْ وَ رَضُوْا عَنْهُ وَ اَعَدَّ لَهُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِیْ تَحْتَهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِیْنَ فِیْهَاۤ اَبَدًاؕ-ذٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِیْمُ


“আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্য থেকে যারা সর্বপ্রথম (ঈমান গ্রহণে) অগ্রগামী, এবং যারা সৎপথে ও সুন্দরভাবে তাদের অনুসরণ করেছে—আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। আর তিনি তাদের জন্য এমন জান্নাতসমূহ প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরকাল, অনন্তকাল অবস্থান করবে। এটাই মহাসাফল্য।”

( সূরা তাওবা, আয়াত ১০০ )


✅সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمْ ন্যায়পরায়ণ এবং জান্নাতি


এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمْ ন্যায়পরায়ণ (আদিল) এবং জান্নাতি। তাঁদের মধ্যে কেউ গুনাহগার বা ফাসিক নন। সুতরাং যে হতভাগা ব্যক্তি কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বা কোনো বর্ণনার ভিত্তিতে সাহাবায়ে কিরাম رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمْ-এর মধ্য থেকে কাউকে ফাসিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে, তার বক্তব্য প্রত্যাখ্যাত; কারণ তা এ আয়াতের সুস্পষ্ট বিরোধী। এমন ব্যক্তির উচিত নিম্নোক্ত হাদীসে পাক হৃদয়ের দৃষ্টি দিয়ে পাঠ করা এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের চেষ্টা করা।


হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,


“আমার সাহাবায়ে কিরাম رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمْ-এর ব্যাপারে আল্লাহ عَزَّوَجَلَّ-কে ভয় করো, আল্লাহ عَزَّوَجَلَّ-কে ভয় করো। আমার পরে তাদেরকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ো না। কেননা, যে ব্যক্তি তাদেরকে ভালোবেসেছে, সে আমার ভালোবাসার কারণেই তাদেরকে ভালোবেসেছে। আর যে ব্যক্তি তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেছে, সে আমার প্রতি বিদ্বেষের কারণেই তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেছে। যে তাদেরকে কষ্ট দিয়েছে, সে আমাকে কষ্ট দিয়েছে। আর যে আমাকে কষ্ট দিয়েছে, সে আল্লাহ عَزَّوَجَلَّ-কে কষ্ট দিয়েছে। আর যে আল্লাহ عَزَّوَجَلَّ-কে কষ্ট দেয়, অচিরেই আল্লাহ عَزَّوَجَلَّ তাকে পাকড়াও করবেন।”


(ইমাম তিরমিযী, কিতাবুল মানাকিব, ‘নবী ﷺ-এর সাহাবাদের গালি দেওয়া সম্পর্কে’ অধ্যায়, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৬৩, হাদীস নং ৩৮৮৮)


✅আফযলিয়তের (শ্রেষ্ঠত্বের) ক্ষেত্রে হযরত আলী رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْه-এর অবস্থান


সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে, হযরত মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যাহ رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْه বলেন,


“আমি আমার সম্মানিত পিতা হযরত আলী رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْه-কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তিকালের পর মানুষের মধ্যে সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ কে?’


তিনি বললেন, ‘আবূ বকর।’ অর্থাৎ, হযরত আবূ বকর رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْه-ই সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ।


আমি আরয করলাম, ‘তারপর কে?’


তিনি বললেন, ‘উমর।’ অর্থাৎ, তাঁর পরে হযরত উমর رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْه-ই সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ।


হযরত মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যাহ رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْه বলেন, ‘আমি আশঙ্কা করলাম যে, এবার তিনি হযরত উসমান رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْه-এর নাম উল্লেখ করবেন। তাই আমি বললাম, “তারপর তো আপনিই সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ?”’


তখন হযরত আলী رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْه বললেন,

“আমি তো মুসলমানদেরই একজন সাধারণ ব্যক্তি।”

(মিশকাতুল মাসাবীহ, কিতাবুল মানাকিব, ‘হযরত আবূ বকর رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْه-এর ফযীলত’ অধ্যায়, প্রথম পর্ব, হাদীস নং ৬০২৪, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪১৫)


✅সাহাবায়ে কিরামের নিকট মর্যাদার ধারাবাহিকতা


সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে, হযরত ইবনে উমর رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمَا বলেন,


“রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাহ্যিক জীবদ্দশায় আমরা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْه-এর সমকক্ষ কাউকে মনে করতাম না; অর্থাৎ তিনিই সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ ও উত্তম বলে গণ্য হতেন। এরপর হযরত উমর رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْه-কে এবং তাঁর পরে হযরত উসমান رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْه-কে (শ্রেষ্ঠ বলে মানতাম)। অতঃপর হযরত উসমান رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْه-এর পর আমরা অন্যান্য সাহাবায়ে কিরামকে তাঁদের নিজ নিজ মর্যাদার উপর ছেড়ে দিতাম এবং তাঁদের পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করতাম না।”


(সহীহ বুখারী, কিতাবু ফাযায়িলি আসহাবিন নবী ﷺ, ‘হযরত উসমান رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْه-এর ফযীলত’ অধ্যায়, হাদীস নং ৩৬৯৭, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৩০)



✍️হাফেজ মাওলানা সোহেল রেযা কাদেরী মাদানী