শিশুদের প্রতি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ভালোবাসা ও স্নেহ
শিশুরা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য এক বিশেষ আমানত। তাদের ভালোবাসা, স্নেহ করা, যত্ন নেওয়া এবং সুন্দরভাবে গড়ে তোলা প্রত্যেক বাবা-মা ও অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আর শিশুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে—তার সর্বোত্তম আদর্শ আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর পবিত্র জীবন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ শুধু মানুষকে শিশুদের প্রতি দয়া করার নির্দেশই দেননি; বরং নিজের জীবনেও শিশুদের প্রতি অসাধারণ ভালোবাসা ও মমতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
শিশুদের চুমু দিতেন রাসূলুল্লাহ ﷺ
হযরত আবু হুরায়রা رضي الله عنه থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ হযরত হাসান বিন আলী رضي الله عنهما-কে চুম্বন দিলেন। তখন তাঁর কাছে আকরা‘ বিন হাবিস আত-তামীমী বসে ছিলেন। আকরা‘ বললেন, “আমার দশজন সন্তান রয়েছে; কিন্তু আমি তাদের কাউকেই কখনো চুম্বন দিইনি।”
তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন—
مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ
“যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।”
সূত্র:সহিহ বুখারি, কিতাবুল আদব, হাদিস-৫৯৯৭,
এই হাদিস আমাদের শেখায়, সন্তানকে আদর করা, চুমু দেওয়া এবং ভালোবাসা প্রকাশ করা নবীজির ﷺ সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত সুন্দর আচরণ।
সতর্কতা- তবে বর্তমান সময়ে সন্তানকে চুমু দেওয়ার ক্ষেত্রে খুবই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। ছোট বাচ্চাকে চুমু দেওয়াতে কোনো সমস্যা নেই, তবে বাচ্চা যদি বড় হয় আর বিশেষত যদি কন্যা সন্তান থাকে তাহলে তাকে চুমু দেওয়া থেকে বিরত থাকা উত্তম। কেননা বর্তমান সময়ে মানুষ এই কাজকে বিকৃতভাবে ব্যবহার করে সুযোগের অপব্যবহার করার চেষ্টা করে। সুতরাং কন্যা সন্তানকে চুমু দেওয়া থেকে বিরত থাকাই উত্তম যদি সে বড় হয়। আর বিশেষত ঠোঁটে চুমু দেওয়া থেকে বিরত থাকা দরকার। আর এক্ষেত্রে বাচ্চাদের শিক্ষা দেওয়া উচিত- কে চুমু দিতে পারবে আর কে দিতে পারবে না, অর্থাৎ নিজের মা বাবা চুমু দিতে পারবে। অপরিচিত কোনো ব্যক্তি যদি চুমু দিতে যায় তাহলে তাকে যেন তারা বাধা দেয়।
শিশুর কান্নার প্রতি নবীজির ﷺ সংবেদনশীলতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ নামাজে দীর্ঘ কিরা'আত করার ইচ্ছা করতেন। কিন্তু নামাজের মধ্যে কোনো শিশুর কান্না শুনলে তিনি নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন, যাতে শিশুটির মায়ের কষ্ট না হয়।
তিনি ﷺ বলেন—
إِنِّي لَأَدْخُلُ فِي الصَّلَاةِ وَأَنَا أُرِيدُ إِطَالَتَهَا، فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأَتَجَوَّزُ فِي صَلَاتِي مِمَّا أَعْلَمُ مِنْ شِدَّةِ وَجْدِ أُمِّهِ مِنْ بُكَائِهِ
“আমি নামাজে প্রবেশ করি (শুরু করি) এবং তা দীর্ঘ করার ইচ্ছা রাখি। অতঃপর শিশুর কান্না শুনলে আমি আমার নামাজ সংক্ষিপ্ত করি; কারণ আমি জানি, তার কান্নার কারণে তার মা কষ্ট অনুভব করেন।”
সূত্র:সহিহ বুখারি, কিতাবুল আযান, হাদিস-৭০৯।
এখানে শিশু ও তার মায়ের অনুভূতির প্রতি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর গভীর মমতা ও কোমলতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
নামাজের মধ্যেও শিশুর প্রতি যত্নবান
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শিশুদের প্রতি ভালোবাসার আরেকটি অনন্য দৃষ্টান্ত হলো— তিনি নামাজের মধ্যেও শিশুকে যত্ন করেছেন।
হযরত আবু কাতাদা رضياللهعنه বলেন—
رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُصَلِّي لِلنَّاسِ وَأُمَامَةُ بِنْتُ أَبِي الْعَاصِ عَلَى عُنُقِهِ، فَإِذَا سَجَدَ وَضَعَهَا
“আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মানুষের ইমামতি করে নামাজ পড়তে দেখেছি, তখন উমামাহ বিনতে আবিল আস رضي الله عنها তাঁর ঘাড়ের ওপর ছিলেন। তিনি যখন সিজদা করতেন, তখন তাকে নামিয়ে রাখতেন।”
সূত্র:সহিহ মুসলিম, কিতাবুস সালাত, হাদিস-৫৪৩।
ছোটদের প্রতি রহমত করা—নবীজির ﷺ শিক্ষা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ شَرَفَ كَبِيرِنَا
“যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের বড়দের মর্যাদা জানে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
সূত্র:তিরমিজি, হাদিস-১৯২০।
আমাদের জন্য শিক্ষা
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন থেকে আমরা স্পষ্ট শিক্ষা পাই—শিশুদের ভালোবাসা ও স্নেহ করা ইসলামের সৌন্দর্যের অংশ। সন্তানকে শুধু খাবার, পোশাক ও পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দেওয়াই যথেষ্ট নয়; তাদের ভালোবাসা, আদর, সময়, নিরাপত্তা ও মানসিক প্রশান্তিও দিতে হবে।
আজকের শিশুই আগামী দিনের পরিবার ও সমাজের মানুষ। তাই তাদের সঙ্গে রূঢ়তা ও অবহেলার পরিবর্তে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দেখানো রহমত, ভালোবাসা ও কোমলতার পথ অনুসরণ করা আমাদের কর্তব্য।
আসুন, আমরা আমাদের ঘর থেকেই এই সুন্নাহকে জীবিত করি—সন্তানদের ভালোবাসি, তাদের আদর করি, তাদের কথা শুনি, ভুল হলে সুন্দরভাবে সংশোধন করি এবং দ্বীন ও উত্তম চরিত্রের শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলি।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সন্তানদের প্রতি রহমতশীল হওয়ার এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্দর সুন্নাহ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
✍️ মুফতি সৈয়দ ইমতিয়াজ কাদরি
