بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
আল্লাহর নির্দেশ: অনুগ্রহ পেয়ে আনন্দিত হও
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইরশাদ করেন:
قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَٰلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ
"বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত পেয়ে যেন তারা আনন্দিত হয় — এটাই তাদের সঞ্চিত সমস্ত সম্পদের চেয়ে উত্তম।" (সূরা ইউনুস, আয়াত ৫৮)
এই আয়াতে আল্লাহ পাক সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছেন — যখনই তাঁর পক্ষ থেকে কোনো দয়া বা অনুগ্রহ বান্দার কাছে পৌঁছায়, তখন সেই বান্দার কর্তব্য হলো তাতে আনন্দিত হওয়া, খুশি প্রকাশ করা। এই আনন্দকে আল্লাহ নিজেই দুনিয়ার সমস্ত সঞ্চিত সম্পদের চেয়েও উত্তম বলে ঘোষণা করেছেন।
রাসূলুল্লাহই আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ
এখন প্রশ্ন হলো — আল্লাহর সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ কোনটি? এর উত্তর আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন সূরা আলে ইমরানে:
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ
"নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল পাঠালেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াত পাঠ করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন — যদিও ইতিপূর্বে তারা স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় ছিল।" (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৬৪)
লক্ষ করার বিষয় হলো, আল্লাহ পাক এখানে "মান্না" (مَنَّ) শব্দটি ব্যবহার করেছেন — যা বিশেষ, মূল্যবান অনুগ্রহ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। আল্লাহ আমাদের অসংখ্য নিয়ামত দিয়েছেন — চোখ, কান, রিযিক, পানি, আলো-বাতাস — কিন্তু এসবের কোনোটির প্রসঙ্গে তিনি "মান্না আলাল মুমিনীন" (মুমিনদের ওপর আমার অনুগ্রহ হলো) বলেননি। শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের প্রসঙ্গেই এই বিশেষ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে।
দুই আয়াতের সংযোগ
এখন এই দুটি আয়াতকে পাশাপাশি রাখলে একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে:
- আল্লাহর নির্দেশ: "অনুগ্রহ ও রহমত পেলে আনন্দিত হও" (ইউনুস ৫৮)
- আল্লাহর ঘোষণা: "রাসূলের আগমন আমার বিশেষ, সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ" (আলে ইমরান ১৬৪)
এই দুটি মিলিয়ে সহজেই বোঝা যায় — রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনে আনন্দ প্রকাশ করা আল্লাহরই সাধারণ নির্দেশের একটি প্রয়োগ, বরং সবচেয়ে যথাযথ প্রয়োগ। এটি কোনো নতুন উদ্ভাবিত বিষয় নয় — বরং কুরআনের একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনাকে তার সবচেয়ে উপযুক্ত ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা মাত্র।
রাসূলুল্লাহ নিজে যেভাবে প্রমাণ করলেন
এই বিষয়ে সবচেয়ে সরাসরি প্রমাণ আসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের কথা থেকে। হাদিসে এসেছে:
عَنْ أَبِي قَتَادَةَ الْأَنْصَارِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ الِاثْنَيْنِ، فَقَالَ: ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ، وَيَوْمٌ بُعِثْتُ فِيهِ أَوْ أُنْزِلَ عَلَيَّ فِيهِ
"আবু কাতাদা আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন — এই দিনে আমার জন্ম হয়েছে, আর এই দিনেই আমার প্রতি ওহী নাযিল হয়েছে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস ১১৬২)
এই হাদিস থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় — রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাঁর জন্মদিনকে একটি ইবাদতের (রোজার) কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি নিজের জন্মের নিয়ামতে শুকরিয়া আদায়ের জন্য রোজা রেখেছেন — এবং এই আমল তিনি সারা জীবন প্রতি সপ্তাহে পালন করে গেছেন। এখান থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে, নিজের জন্মদিন উপলক্ষে শুকরিয়াস্বরূপ কোনো নেক আমল করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজস্ব সুন্নত দ্বারা সমর্থিত — এটি খারাপ কিছু নয়।
র্যালি/জুলুস: ইবাদত নয়, শুধু আনন্দের বহিঃপ্রকাশ
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার। মিলাদুন্নবী উপলক্ষে যে র্যালি বা জুলুস করা হয়, তা কোনোভাবেই ইবাদত হিসেবে দাবি করা হয় না। এটি নামায, রোজা বা কুরআন তেলাওয়াতের মতো কোনো নির্দিষ্ট শরয়ী ইবাদত নয় — বরং এটি নিছক আনন্দ প্রকাশের একটি বাহ্যিক, সামাজিক মাধ্যম, ঠিক যেমন কেউ বিয়ের অনুষ্ঠানে ঘর সাজায় বা ঈদের দিনে নতুন পোশাক পরে রাস্তায় বের হয়। ইউনুস ৫৮ আয়াতে আল্লাহ যে "আনন্দ প্রকাশ" করতে বলেছেন, তার কোনো নির্দিষ্ট শরয়ী রূপ বেঁধে দেওয়া হয়নি — তাই শরীয়তসম্মত যেকোনো পন্থায় (রোজা, নামায, দান-সদকা, অথবা নিছক সামাজিক আনন্দ প্রকাশ) এই নির্দেশ পালন করা যায়।
তাই দুটি বিষয়কে আলাদা রাখা জরুরি:
- ইবাদতের অংশ: রোজা, নফল নামায, কুরআন তেলাওয়াত, দরূদ পাঠ, দান-সদকা — এগুলো স্বতন্ত্রভাবেই শরয়ী ইবাদত, যা রাসূলুল্লাহর জন্মদিন উপলক্ষে করা তাঁরই সোমবারের রোজার সুন্নত অনুসরণ করে।
- আনন্দের বহিঃপ্রকাশ: র্যালি, জুলুস, সাজসজ্জা — এগুলো ইবাদত নয়, বরং নিছক সামাজিক প্রথা ও আনন্দ প্রকাশের ধরন, যা মূলগতভাবে বৈধ (মুবাহ) — যতক্ষণ না তাতে শরীয়তবিরোধী কোনো উপাদান (যেমন নারী-পুরুষ অবাধ মেলামেশা, অপচয়, জনভোগান্তি) যুক্ত হয়।
সারকথা
এই তিনটি দলিল — ইউনুস ৫৮ (আনন্দ প্রকাশের নির্দেশ), আলে ইমরান ১৬৪ (রাসূল সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ), এবং সহীহ মুসলিম ১১৬২ (রাসূলের নিজের জন্মদিন-কেন্দ্রিক আমল) — একত্রে মিলিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের দিনে খুশি প্রকাশ করা, নেক আমল করা, এবং সামাজিকভাবে আনন্দ উদযাপন করা — এর কোনোটিই শরীয়তের বিরোধী নয়। ইবাদত ও সামাজিক আনন্দ প্রকাশের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রেখে এই দিনটি পালন করাই এই আলোচনার মূল বার্তা।✍️ মুফতি সৈয়দ ইমতিয়াজ
